আর্ন্তজাতিক

বৈদেশিক সহায়তা হ্রাসে ১০ লাখ নারী ও কন্যাশিশু জরুরি সেবা বঞ্চিত: জাতিসংঘ

ঢাকা, (১০ জুলাই, ২০২৬) ওপেনপ্রেস২৪ ডেস্ক/বাসস : বৈদেশিক সহায়তা ব্যয় ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় অন্তত ১০ লাখ নারী ও কন্যাশিশু জীবনরক্ষাকারী জরুরি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে শুক্রবার সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেরে বরাতে জেনেভা থেকে এএফপি জানায়, প্রয়োজনীয় সহায়তার চাহিদা দ্রুত বাড়লেও নারী অধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলো কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে রয়েছে।

গত বছর দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈদেশিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেন। একই সঙ্গে অন্যান্য প্রধান দাতা দেশও সহায়তা ব্যয় সংকুচিত করেছে।

ইউএন উইমেনের মানবিক কার্যক্রমবিষয়ক প্রধান সোফিয়া ক্যালটর্প জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন,  এর ফলে,  ‘সংঘাত ও সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত অন্তত ১০ লাখ নারী ও কন্যাশিশু অত্যাবশ্যকীয় সেবা ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ হারিয়েছে।’

স্টকহোম থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, এই সংখ্যা হিমশৈলের চূড়ামাত্র।’ নতুন প্রতিবেদনের তথ্যকে তিনি  ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেন।

তিনি জানান, বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা নারী সংগঠনগুলো আফগানিস্তান, গাজা, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, সুদান ও ইয়েমেনের মতো বিশ্বের সবচেয়ে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ সংকটপূর্ণ এলাকায় সম্মুখসারিতে কাজ করছে।

ক্যালটর্প বলেন,‘নারী সংগঠনগুলোর জন্য প্রত্যাহার করা প্রতিটি ডলার মানে সংঘাতজনিত যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তি, বাস্তুচ্যুত মা, বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হওয়া মেয়েশিশু এবং টিকে থাকার সংগ্রামে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে একটি ডলার কমে যাওয়া।’

১২ কোটি নারী ও কন্যাশিশুর সহায়তা প্রয়োজন

ইউএন উইমেন জানায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছানো সশস্ত্র সংঘাতের কারণে বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১২ কোটি নারী ও কন্যাশিশুর মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন।

৫২টি সংকটাপন্ন দেশের ৮৫৫টি নারী নেতৃত্বাধীন ও নারী অধিকার সংগঠনের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে  ৮৪ শতাংশ সংগঠনের সেবার চাহিদা বেড়েছে।

সংস্থাটি জানায়, ‘প্রতি ১০টির মধ্যে প্রায় ৯টি সংগঠন বর্তমান চাহিদা পূরণে সক্ষম নয় এবং প্রতি পাঁচটির মধ্যে দুটি সংগঠন আগামী এক বছরের মধ্যে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে।

সংগঠনগুলো টিকিয়ে রাখতে নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা নিজেদের শ্রম ও ব্যক্তিগত সুস্থতাকে উৎসর্গ করছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জরিপে অংশ নেওয়া নারী নেতৃত্বাধীন ৬৫ শতাংশ সংগঠন জানিয়েছে, কর্মীরা বেতন ছাড়াই কাজ করছেন। প্রায় অর্ধেক সংগঠন কর্মীদের মধ্যে চরম মানসিক অবসাদ (বার্নআউট) বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে।

ক্যালটর্প সতর্ক করে বলেন, ২০২৫ সালে সংঘাত-সম্পর্কিত যৌন সহিংসতার ঘটনা দ্বিগুণ হয়েছে, অথচ ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার জন্য গড়ে তোলা ব্যবস্থাগুলোই ভেঙে পড়ছে।

ইউএন উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া ৮৬ শতাংশ সংগঠন তাদের কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।

নারীর অধিকারেও বাড়ছে চাপ

ইউএন উইমেন বলছে, এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

সংস্থাটি জানায়, ‘সহিংসতা থেকে আশ্রয় নিতে আসা একজন নারী হয়তো এসে দেখবেন আশ্রয়কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেছে। একজন গর্ভবতী নারীকে হয়তো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতে হবে। আবার কোনো মা তার সন্তানদের জন্য খাদ্য সহায়তাও নাও পেতে পারেন।’

সংস্থাটি আরও জানায়, এই সংকট শুধু মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকেই দুর্বল করছে না, বরং বিশ্বজুড়ে নারী ও কন্যাশিশুর অধিকারের ওপর চলমান নেতিবাচক প্রবণতাকেও আরও তীব্র করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রতি পাঁচটির মধ্যে একটি সংগঠন ইতোমধ্যে নারীর নেতৃত্ব ও লিঙ্গসমতা উন্নয়নের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এছাড়া অর্ধেকেরও বেশি সংগঠন স্থানীয় নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করেছে।

ক্যালটর্প বলেন, নারী সংগঠনগুলোর অর্থসংকট এবং নারীর অধিকার ক্ষয়ের সম্মিলিত প্রভাব সমাজে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ সংগঠন তাদের সেবাগ্রহীতা নারীদের মধ্যে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে।

এছাড়া প্রতি ১০টির মধ্যে ৮টি সংগঠন মেয়েদের বিদ্যালয়ত্যাগের হার বাড়তে দেখেছে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ সংগঠন বাল্য ও জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে।

ক্যালটর্প বলেন, ‘অর্থায়নের ঘাটতি বৈষম্য ও বিভাজনকে আরও গভীর করে, যার মূল্য সমাজকে অত্যন্ত চড়া দামে দিতে হয়।’

Share

Follow us