আইন-আদালত

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি : সাক্ষী না আসায় ১৩ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি হত্যা মামলা

\\ জাহাঙ্গীর আলম \\ বাসস \\

ঢাকা, ওপেনপ্রেস২৪ নিউজ ডেস্ক : ১৩ বছর আগে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার সাভারের রানা প্লাজায় ঘটে দেশের ইতিহাসের এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। আটতলা ভবনে অবৈধভাবে স্থাপন করা কারখানাটি ধসে পড়ে নিহত হন ১ হাজার ১৩৬ জন। প্রায় ১ হাজারের মতো মানুষ গুরুতর জখম হন। তাদের সবাই পোশাক শ্রমিক।

সাক্ষী না আসায় এ ঘটনায় করা হত্যা মামলাটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। সাক্ষীরা আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেছেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যাশা— এ বছরই সাক্ষী হাজির করে মামলাটি নিষ্পত্তি করা হবে।

বর্তমানে রানা প্লাজা মামলাটি ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৮ম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ মামলায় ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মামলার এজাহারকারী পুলিশের এসআই ওয়ালি আশরাফ খানসহ মোট ১৪৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে।

মামলার বিচার কাজের বিষয়ে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. ইকবাল হোসেন বাসস-কে বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় করা মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ। মামলাটিতে অনুপস্থিত সাক্ষীদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আগামী ৩০ এপ্রিল মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। আমরা আশা করছি, এদিন অনেক সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হবেন। এ বছরেই মামলাটি শেষ করতে পারবো বলে আমি আশাবাদী।

সংশ্লিষ্ট আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ফয়সাল মাহমুদ বাসস-কে বলেন, ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৮ম আদালতের বিচারক মুহাম্মদ মুনির হোসাঈন ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর হতে আলোচিত রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি মামলাটি দ্রুত বিচার ও নিষ্পত্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের উপস্থিত করতে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপারকে ইতোমধ্যে পরপর তিনটি ধার্য তারিখ নির্দেশনা প্রদান পূর্বক আদেশনামা প্রেরণ করেন। কিন্তু আলোচিত রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি মামলাটি দীর্ঘ ১৩ বছর পুরাতন মামলা হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ বিভাগের পক্ষ হতে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের আদালতে উপস্থাপিত না হওয়ায় মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের কার্যক্রম এখনো সমাপ্ত করা সম্ভব হয়নি। আলোচিত মামলাটিতে আগামী ৩০ এপ্রিল গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের উপস্থাপন করার জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আশা করা যায়, মামলার সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের দ্রুত আদালতে উপস্থিত করা গেলে অতিদ্রুত মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ক্রমে আলোচিত রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ঘটনার ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

আসামি সোহেল রানার আইনজীবী মাসুদ রানা বাসস-কে বলেন, মামলায় একমাত্র রানা কারাগারে আটক আছেন। মামলাটিতে অধিকাংশ সময় সাক্ষী হাজির হচ্ছে না। আমরা চাই মামলাটি সাক্ষী হাজির করে দ্রুত নিষ্পত্তি হোক।

হত্যা মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ঢাকা জেলার সাভার থানাধীন রানা প্লাজা ভবনটিতে ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেয়। পরের দিন ২৪ এপ্রিল সকাল ৯ টা ৪৫ মিনিটের দিকে ভবনে ফাটল থাকা সত্ত্বেও ভবনে অবস্থিত ৪টি গার্মেন্টস কোম্পানির মালিক ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগণ জোরপূর্বক গার্মেন্টসের শ্রমিকদের কাজে নিয়োজিত হতে বাধ্য করেন। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ৯ টা ৪৫ মিনিটের দিকে ফাটলকৃত রানা প্লাজা ভবনের ৩টি ফ্লোরে বৈদ্যুতিক জেনারেটর চালু হওয়া মাত্র বিকট শব্দে রানা প্লাজা ভবনটি ধসে পড়ে এবং দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ভয়াবহ বিল্ডিং ধসের ঘটনা রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়। এ ঘটনায় মামলার পুলিশ রিপোর্ট  অনুযায়ী মোট ১ হাজার ১৩৬ জন গার্মেন্টস শ্রমিকসহ রানা প্লাজায় কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ মৃত্যু বরণ করেন এবং প্রায় ১ হাজার জনের মতো মানুষ গুরুতর জখম হন। এ ঘটনায় পর দিন ২৫ এপ্রিল সাভার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ওই থানার এসআই ওয়ালি আশরাফ খান।

মামলাটি তদন্ত করে ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলায় সাক্ষী করা হয় ৫৯৪ জনকে। ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ এস এম কুদ্দুস জামান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। মামলায় ৪১ জন আসামির মধ্যে একমাত্র আসামি মো. সোহেল রানা জেলহাজতে আটক রয়েছেন। বাকি ৪০ জন আসামির মধ্যে দু’জন আসামি, সোহেল রানার পিতা আব্দুল খালেক ও মাতা মর্জিনা বেগম মৃত্যুবরণ করেছেন এবং সাভার পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. রেফাত উল্লাহসহ মোট ১৩ জন আসামি পলাতক রয়েছেন এবং বাকি ২৫ জন আসামি বিভিন্ন সময় হাইকোর্ট বিভাগ হতে জামিন প্রাপ্ত হয়ে জামিনে রয়েছেন।

দুদকের মামলায় রানা ও তার মায়ের সাজা : ভবন ধসের পর পালিয়ে যাওয়া রানাকে ঘটনার কয়েকদিন পর যশোর থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর রানার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা হয়। তার সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা করে। ওই মামলায় ২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট সোহেল রানাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬ এর বিচারক কে এম ইমরুল কায়েস। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এদিকে, জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে রানার মা মর্জিনা বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এ মামলায় ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ তাকে ছয় বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে তার প্রায় ৭ কোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন আদালত।

Share

Follow us